Tuesday, 31 May 2011

মধ্যে দাবি না মানলে হরতাল : চরমোনাই পীর











ইসলামী আন্দোলনের সমাবেশে পুলিশি হামলা : পল্টন রণক্ষেত্র : এক মাসের

স্টাফ রিপোর্টার
মে দিবস উপলক্ষে মুক্তাঙ্গনে আয়োজিত ইসলামী আন্দোলনের গণঅবস্থান ও দোয়া অনুষ্ঠানে পুলিশ এবং সরকারি দলের ক্যাডারদের অতর্কিত হামলায় রোববার সন্ধ্যায় পল্টন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জ, মুহুর্মুহু টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট এবং পানিকামান থেকে গরম পানি নিক্ষেপে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও চরমোনাই পীরের বড় ভাইসহ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। পুলিশের পাশাপাশি সরকারি দলের লোকেরাও লাঠিসোটা নিয়ে হামলায় অংশ নেয়। ঘটনাস্থল ও বিভিন্ন স্থান থেকে পুলিশ আটক করে দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে। ঘটনার পর থেকে
পুরানাপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘেরাও করে রেখেছে পুলিশ। এছাড়া মুক্তাঙ্গনসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ১৪৪ ধারা বহালসহ বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল সকাল থেকে ঘোষিত ৪৮ ঘণ্টার গণঅবস্থান কর্মসূচি স্থগিত করে ইসলামী আন্দোলন।
এদিকে পূর্বঘোষিত গণঅবস্থান কর্মসূচি বানচালে মুক্তাঙ্গনে সরকারের ১৪৪ ধারা জারি এবং মে দিবসের আলোচনা ও দোয়া অনুষ্ঠানে পুলিশের বর্বর হামলার তীব্র নিন্দা জানান দলের আমির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করিম। গতকাল এক প্রেসব্রিফিংয়ে তিনি চলতি মাসের মধ্যে নারীনীতি বাতিল করার জন্য সরকারের প্রতি আল্টিমেটাম দেন। অন্যথায় হরতালসহ কঠোর কর্মসূচি দেয়ার হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এছাড়া ৪ মে সারাদেশে সব থানায় ও ৫ মে মুক্তাঙ্গনে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল কর্মসূচির ঘোষণা দেন তিনি।
সংঘর্ষের সূত্রপাত যেভাবে : রোববার বিকাল ৪টায় পুরানাপল্টনের হাউস বিল্ডিং মোড়ে শ্রমিক সমাবেশ করে ইসলামী আন্দোলন। একই সময়ে মুক্তাঙ্গনে জাতীয় পার্টির সমাবেশ চলছিল। এই সমাবেশ শেষ হওয়ার পর ৬টায় চরমোনাই পীরের নেতৃত্বে ইসলামী আন্দোলনের সমাবেশরত নেতাকর্মীরা একটি মিছিল বের করে মুক্তাঙ্গনে জমায়েত হন। সেখানে মাগরিবের নামাজের পর মে দিবসের শহীদদের জন্য দোয়া ও মোনাজাত করার ঘোষণা দেয় সংগঠনটি। তবে তারা পরদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে গণঅবস্থানের জন্য মু্ক্তাঙ্গন দখলে নিয়েছে, এমন সংবাদের ভিত্তিতে তাদের সেখানে জমায়েতে বাধা দেয় পুলিশ। তাদের দ্রুত স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ দেয় পুলিশ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের নেতারা মাগরিবের পর দোয়া শেষেই স্থান ত্যাগ করার কথা জানান। এরই মধ্যে কয়েক হাজার নেতাকর্মী সেখানে মাগরিবের নামাজ আদায় করে দোয়া অনুষ্ঠানের অপেক্ষায় ‘আল্লাহু আল্লাহু, লা ইলাহা ইল্লাহ’ জিকির শুরু করেন।
সন্ধ্যা ৭টায় পুলিশ হঠাত্ তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। তারা পানিকামান দিয়ে গরম পানি নিক্ষেপ, বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপের পাশাপাশি বেপরোয়া লাঠিচার্জ শুরু করলে মুক্তাঙ্গন-পল্টনসহ গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বন্ধ হয়ে যায় যানচলাচল। চরমোনাই পীরসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও এসময় হামলার শিকার হন। তীব্র আক্রমণের মধ্যেও ইসলামী আন্দোলন কর্মীরা উচ্চস্বরে জিকির করতে থাকেন এবং গাছের ডাল ও ইটপাটকেল নিয়ে পুলিশের আক্রমণের পাল্টা প্রতিরোধ করে বেশ কিছুক্ষণ রাস্তায় অবস্থান নেন। একপর্যায়ে পুলিশের হামলায় তারা পিছু হটতে বাধ্য হন। এসময় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও চরমোনাই পীরের বড় ভাই সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল-মাদানী এবং পুলিশ ও সাংবাদিকসহ ২ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে শাহবাগ, পল্টনসহ বিভিন্ন থানায় নিয়ে যায়। এদের মধ্য থেকে অনেককে গভীর রাতে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। এদিকে পল্টন ও বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেট এলাকা বিপুলসংখ্যক পুলিশ কর্ডন দিয়ে রাখায় বিক্ষোভকারীরা সেদিকে যেতে পারেননি। পুলিশের ধাওয়ায় তারা জিরো পয়েন্ট হয়ে গুলিস্তানের দিকে গেলে সেখানে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা লাঠিসোটা নিয়ে আরেক দফা হামলা চালায়। এতে গুরুতর আহত কয়েকজনসহ বেশকিছু নেতাকর্মী আহত হন। হামলার পর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীরা মুক্তাঙ্গন এলাকায় খণ্ড খণ্ড মিছিলও করে। হাতে ও পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত মোসাদ্দেক বিল্লাহ মাদানীকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে ও পরে একটি ক্লিনিকে নেয়া হয়। আহত অন্যান্য নেতাকর্মীদেরও ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন ক্লিনিক ও কেন্দ্রীয় অফিসে প্রাথমিক চিকিত্সা দেয়া হয়। মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত ১০-১২ জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
এদিকে সংঘর্ষের পর ব্যাপক পুলিশ ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় অফিস ঘেরাও করে রাখে। রাতে সেখানে কাউকে ঢুকতে দেয়া তো দূরের কথা, অবস্থানরত আহত নেতাকর্মীদের বের করে দেয়া হয় বলে কেন্দ্রীয় নেতা আহমদ আবদুল কাইয়ুম জানান।
উল্লেখ্য নারীনীতি, শিক্ষানীতি ও ফতোয়াবিরোধী হাইকোর্টের রায় বাতিলসহ বিভিন্ন দাবিতে বেশ কিছু দিন আগে ২ ও ৩ মে মুক্তাঙ্গনে গণঅবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেয় চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন। এ উপলক্ষে কয়েক লাখ লোক সমাগমের প্রস্তুতি নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক প্রচারণা চালায় দলটি। কিন্তু দু’দিন আগে শনিবার সন্ধ্যায় একই স্থানে আরও দুটি সংগঠনের কর্মসূচি দেয়ার অজুহাতে গতকাল সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মুক্তাঙ্গন ও আশপাশের এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। এ ঘোষণা সত্ত্বেও শনিবার সন্ধ্যায় এক জরুরি বৈঠক করে ২ ও ৩ মে মুক্তাঙ্গনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয় ইসলামী আন্দোলন। এ নিয়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি বহাল ছিল।
প্রেস ব্রিফিংয়ে চরমোনাই পীর : মুক্তাঙ্গনে ১৪৪ ধারা জারি ও মে দিবসের আলোচনা ও দোয়া অনুষ্ঠানে পুলিশের বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে পুরানাপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিং করেন ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করিম। এসময় তিনি সরকার ও পুলিশের বর্বর আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, ক্ষমতায় গেলে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কিছু করবে না। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরপরই ইসলামবিরোধী যেসব কার্যক্রম হাতে নিয়েছে তাতে প্রমাণিত হয়, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ভোট নেয়ার মোনাফেকি কৌশল। ইসলামকে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে বিধিনিষেধ দুঃসাহসের ব্যাপার। তিনি বলেন, আমরা বর্তমান সরকারের কোরআনবিরোধী নারীনীতি, ইসলামী শিক্ষাবিরোধী জাতীয় শিক্ষানীতি, ফতোয়াবিরোধী রায় বাতিল এবং সংবিধানকে ধর্মনিরপেক্ষ করা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সন্ত্রাস-দুর্নীতির প্রতিবাদে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছি। এসব দাবিতে আমরা জেলা প্রশাসক, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছি। সর্বশেষ ২ ও ৩ মে মুক্তাঙ্গনে গণঅবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এতে ১৪৪ ধারা জারি করে সরকার সংবিধানবিরোধী অবস্থান এবং গণতন্ত্র কেড়ে নিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা ইউনূস আহমাদ, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ বেলায়েত হোসেন ও মহানগর আমির অধ্যাপক এটিএম হেমায়েত উদ্দিন প্রমুখ।
নারায়ণগঞ্জে মহাসড়ক অবরোধ : এদিকে মুক্তাঙ্গনে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা গতকাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে এবং সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। এ সময় সড়কে যানচলাচল বন্ধ থাকে। এতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে র্যাব ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ইসলামী আন্দোলন কর্মীরা প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বলে বলে জানা গেছে

টিএইচ খান ও রফিক-উল হক : ফতোয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার এখতিয়ার আদালতের নেই

স্টাফ রিপোর্টার
ফতোয়া নিষিদ্ধ করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরির মতামতে প্রবীণ আইনজীবী টিএইচ খান ও ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, ফতোয়া হচ্ছে পবিত্র কোরআন, হাদিস ও ইসলামী শরিয়াভিত্তিক অভিমত বা উপদেশ। কাজেই ফতোয়াকে নিষিদ্ধ করে রায় দেয়া তো দূরের কথা, এ নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন তোলারও এখতিয়ার কোনো আদালতের নেই। দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের আলোকেও ফতোয়া বৈধ বলে মত দেন তারা। ফতোয়া দেয়া ও নেয়া সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চে গতকাল তারা এ অভিমত পেশ করেন।
উল্লেখ্য, ২০০১ সালে বিচারপতি গোলাম রব্বানীর নেতৃত্বে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ কোনো অভিযোগ বা মামলা ছাড়াই স্বপ্রণোদিত হয়ে ফতোয়া নিষিদ্ধ করে রায় দেন। রায়ের বিরুদ্ধে দুটি আপিল করা হয়। বর্তমানে আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চে এ আপিল দুটির শুনানি একযোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফতোয়ার বিষয়ে মতামত দেয়ার জন্য আদালত সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী বিচারপতি টিএইচ খান এবং সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হকসহ ১০ বিশিষ্ট আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেন।
ব্যারিস্টার রফিক-উল হক : গতকাল ফতোয়া নিয়ে আপিলের শুনানি শুরু হলে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক সংবিধান, বিভিন্ন আইন, বিভিন্ন মামলার নজির ও বিভিন্ন দেশের রেফারেন্স তুলে ধরে আদালতে বলেন, ফতোয়া হচ্ছে সংবিধানস্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার। ফতোয়া নিষিদ্ধ করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তা আদৌ সঠিক নয়। এ ধরনের রায় দেয়ার এখতিয়ার হাইকোর্টের নেই। তিনি বলেন, ফতোয়া হচ্ছে ব্যক্তিগত অভিমত। এ অভিমতের ভিত্তিতেই আমাদের সমাজ ও পারিবারিক শৃঙ্খলা টিকে রয়েছে। অভিমত বা মতামত দেয়ার অধিকার সবার রয়েছে। এটা সাংবিধানিক অধিকারও। তবে কোনো নির্বাহী আদেশ নয়, কেউ ইচ্ছে করলে এটা গ্রহণ করতে পারে আবার নাও করতে পারে। তবে আমাদের দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ফতোয়াকে বাধ্যবাধকতা বলে মনে করে। এজন্য সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ফতোয়ার অপব্যবহার হচ্ছে। এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের দেশে প্রায় সব আইনেরই যেমন ব্যবহার রয়েছে, তেমনিভাবে এর অপব্যবহার আছে। মূল কথা হলো অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এটা করতে গিয়ে যে একেবারে আইনটিই নিষিদ্ধ করে দিতে হবে, এমনটি নয়। তিনি বলেন, কেউ যদি ফতোয়ার নামে কাউকে শাস্তি দেন, তবে সেটি অপরাধ। এ অপরাধের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারেন।
বিচারপতি টিএইচ খান : ফতোয়া নিষিদ্ধ করার অধিকার কোনো আদালতের নেই বলে উল্লেখ করে সিনিয়র আইনজীবী বিচারপতি টিএইচ খান বলেন, যারা ফতোয়া নিষিদ্ধ করে অতি-উত্সাহী রায় দিয়েছেন তারা কি একবার ভেবে দেখেছেন, ফতোয়া নিষিদ্ধ হলে এর পরিণাম কত ভয়ঙ্কর হবে? তারা হয়তো না বুঝেই এটা করেছেন। কিন্তু ফতোয়া নিষিদ্ধ করার এখতিয়ার তাদের ছিল না। তারা এখতিয়ারবহির্ভূত কাজটি করে সমাজকে একটি চরম বিশৃঙ্খল অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ীই ফতোয়া বৈধ এবং ফতোয়া দেয়া ও গ্রহণ করা সাংবিধানিক অধিকার। ফতোয়ার নামে যদি কোথাও কোনো অপরাধ হয়, সেটা প্রতিরোধ বা প্রতিকারের জন্য আমাদের দেশে প্রচলিত আইন রয়েছে। তবে এখন কেউ কেউ গ্রাম্য সালিশকেও ফতোয়া হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে লেগেছেন। এটাও ঠিক নয়। ফতোয়া নিষিদ্ধ হলে আমাদের সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। যৌতুকপ্রথা বেড়ে যাবে। সেইসঙ্গে ইভটিজিংসহ নারী নির্যাতনও বেড়ে যাবে। সামাজিক শৃঙ্খলার জন্যই ফতোয়ার বিষয়টিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ, ৪১ অনুচ্ছেদ থাকলে ধর্মীয় স্বাধীনতাও থাকবে। আর ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকলে মুসলমানদের ফতোয়া দেয়া ও নেয়ার অধিকারও থাকবে। ফতোয়ার নামে যদি কেউ এর অপব্যবহার করে, তার জন্য ইসলামের এই অবিচ্ছেদ্য বিধান অবৈধ ঘোষণা করার কোনো আইনি বা যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
বিচারপতি গোলাম রব্বানী কোনো অভিযোগ কিংবা মামলা ছাড়াই নিজ উদ্যোগে ফতোয়াকে অবৈধ ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ২০০১ সালে রায় দেন। অবসর নেয়ার পর নাস্তিক ও ভারতপন্থী হিসেবে বিচারপতি গোলাম রব্বানী তথাকথিত ঘাদানি কমিটিসহ ইসলামবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের উপদেষ্টার পদ নেন এবং তাদের অনুষ্ঠানগুলোতে যোগ দিয়ে ফতোয়াসহ ইসলামী বিধানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়া অব্যাহত রাখেন। স্বপ্রণোদিত হয়ে ফতোয়া নিষিদ্ধ করে তার দেয়া ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০১ সালেই মুফতি মো. তৈয়ব ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আপিল বিভাগে পৃথকভাবে দুটি আপিল করেন। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। বর্তমানে ওই আপিলের শুনানি চলছে। আদালত দশজন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ করে মতামত নেন। এ ছাড়াও দেশের খ্যাতিমান পাঁচ আলেমকে তাদের মতামত দেয়ার জন্য বলেছেন। গত ২০ মার্চ লিখিতভাবে তারা তাদের মতামত পেশ করেন। পাঁচ আলেমসহ অ্যামিকাস কিউরিদের প্রায় সবাই ফতোয়ার বিধান বহাল রাখা এবং হাইকোর্টের রায় বাতিলের পক্ষে মত দেন।

Tuesday, 26 April 2011

ক্ষমতা ছাড়ার আহ্বান খেলাফত আন্দোলনের : সরকারের ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ডের শ্বেতপত্র প্রকাশ











স্টাফ রিপোর্টার

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের কোরআনবিরোধী নারীনীতিসহ ২০ দফা ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রাথমিক শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। গতকাল রাজধানীর একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়। এ সময় দলের নেতারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন কখনও করবে না। তিনি নির্বাচনী ইশতেহারেও বলেছিলেন ক্ষমতায় গেলে তার সরকার কোরআনবিরোধী কোনো আইন পাস করবে না। কিন্তু ক্ষমতায় বসে বর্তমান সরকার শুধু নারীনীতিই নয় বরং একের পর এক কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কার্যকলাপের জন্ম ও প্রশ্রয় দিচ্ছে। তারা বলেন, সরকার ভালোভাবে দেশ চালালে যতদিন জনগণ চায় চালাক। কিন্তু ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড করলে তা সহ্য করা হবে না। কোরআনবিরোধীদের সঙ্গে আমাদের কোনো আপস নেই। শান্তিপূর্ণভাবে দেশ চালাতে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে এখনই ক্ষমতা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান নেতারা।
শ্বেতপত্রে বলা হয়, মহান আল্লাহতায়ালা ওহির মাধ্যমে যে নারীনীতি দিয়েছেন, নারীদের কল্যাণে তাই যথেষ্ট। কিন্তু সরকার এই নীতি বাদ দিয়ে জাতিসংঘে গৃহীত সিডো অনুসরণ করে তৈরি নতুন নারীনীতি বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আল্লাহর দেয়া নীতি বাদ দিয়ে এই নীতি করাই কোরআনবিরোধী। তাছাড়া সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমঅধিকার কথাটাও বেহুদা। নারীনীতির কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক ধারাগুলোর ব্যাপারে দেশের আলেমরা বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এতে ইসলামবিরোধী কিছু নেই। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
নারীনীতি ছাড়াও সরকারের অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে বলা হয়—রাষ্ট্রপতি ফতোয়া বন্ধ করার যে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন তা কোরআনের সুরা নিসার ১৭৬ নম্বর আয়াতের বিরোধী। রাসূল (সা.)-এর জন্ম নিয়ে কটূক্তিকারীর বিচার না করা হাদিসবিরোধী। পবিত্র কোরআনের বিশুদ্ধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট আবেদন সুরা বাকারার ২ নম্বর আয়াতের বিরোধী। পবিত্র হাজরে আসওয়াদকে শিবলিঙ্গের সঙ্গে তুলনার পরও সরকারের নীরবতা কোরআনবিরোধী। সংবিধানে কোরআনবিরোধী বিভিন্ন বিষয় সংযুক্তি, ভারতের মতো ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার জন্য উঠেপড়ে লাগা, ফরজ বিধান হিজাববিরোধী রায় ও পরিপত্র জারি, অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজালকে বহাল রাখা, আলেম-ওলামা ও কওমি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের অপপ্রচার, ইসলামবিরোধী জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন সরকারের কোরআন-হাদিসবিরোধী কর্মকাণ্ডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
খেলাফত আন্দোলন নেতারা বলেন, সরকার নিজের ভুল না বুঝে উল্টো আন্দোলনকারী হাফেজ, আলেমদের হত্যা, মিথ্যাবাদী বলা, গ্রেফতার, হয়রানি ও গুম করছে কার স্বার্থে দেশবাসী তা জানতে চায়। মুফতি আমিনী হাফেজ্জি হুজুরের এতিম সন্তানদের সম্পদ আত্মসাত্ করেছে বলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য, মিথ্যা ও বানোয়াট। হাফেজ্জি হুজুরের খান্দানের কিছু হলে সরকারের পতন অনিবার্য বলে উল্লেখ করে নেতারা বলেন, সরকার সাংবিধানিকভাবে বৈধ হরতালে বাধা দিয়ে অন্যায় ও অপরাধ করেছে। নারীনীতি নিয়ে তারা যে ফাসাদ সৃষ্টি করছে তাতে বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের চক্রান্তই প্রকাশ পাচ্ছে—যা কোরআনবিরোধী। সরকার রিমান্ডের নামে অমানবিক নির্যাতন, বিনা বিচারে উলঙ্গ করে পুরুষাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেয়া সম্পূর্ণ হারাম ও কোরআন-হাদিসবিরোধী।
২০ দফা ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বাইরেও ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি এবং জুলুমের বর্ণনা দেয়া হয় শ্বেতপত্রে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়, এ সরকারের সময় কোরআন তিলাওয়াতের পরিবর্তে রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু, আল্লাহর ক্ষমতা নিয়ে সিইসি’র কুফরি মন্তব্য, আজান সম্পর্কে বাজে মন্তব্য, মাদ্রাসা ছাত্রের হাত কেটে নেয়া, স্কুলের সাইনবোর্ড থেকে কোরআনের আয়াত তুলে ফেলা, রাবিতে পায়জামা-পাঞ্জাবি, টুপি-দাড়ি ও হিজাবের ওপর আপত্তি করা, ইডেন কলেজে ছাত্রী পাচারের ঘৃণ্য কাজসহ সারাদেশে খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দলপ্রীতিতে ইনসাফ ও মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। এসব কাজ ইসলামবিরোধী। তারা অবিলম্বে নারীনীতিসহ ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড বাতিল, গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে সরকারকে বলেন, হঠকারিতা ছেড়ে শান্তিতে ক্ষমতায় থাকুন। নতুবা ভয়াবহ পরিণতি দেখবেন। তখন হা-হুতাশ করেও লাভ হবে না বলে সতর্ক করেন নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে শ্বেতপত্র পাঠ করেন খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান। এ সময় দলের আমির শাহ আহমদুল্লাহ আশরাফ, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা সাজিদুর রহমান ফয়েজি, ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, মাওলানা ফখরুল ইসলাম, মাওলানা সুলতান মুহিউদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন

টিএইচ খান ও রফিক-উল হক : ফতোয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার এখতিয়ার আদালতের নেই

স্টাফ রিপোর্টার

ফতোয়া নিষিদ্ধ করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরির মতামতে প্রবীণ আইনজীবী টিএইচ খান ও ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, ফতোয়া হচ্ছে পবিত্র কোরআন, হাদিস ও ইসলামী শরিয়াভিত্তিক অভিমত বা উপদেশ। কাজেই ফতোয়াকে নিষিদ্ধ করে রায় দেয়া তো দূরের কথা, এ নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন তোলারও এখতিয়ার কোনো আদালতের নেই। দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের আলোকেও ফতোয়া বৈধ বলে মত দেন তারা। ফতোয়া দেয়া ও নেয়া সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চে গতকাল তারা এ অভিমত পেশ করেন।
উল্লেখ্য, ২০০১ সালে বিচারপতি গোলাম রব্বানীর নেতৃত্বে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ কোনো অভিযোগ বা মামলা ছাড়াই স্বপ্রণোদিত হয়ে ফতোয়া নিষিদ্ধ করে রায় দেন। রায়ের বিরুদ্ধে দুটি আপিল করা হয়। বর্তমানে আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চে এ আপিল দুটির শুনানি একযোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফতোয়ার বিষয়ে মতামত দেয়ার জন্য আদালত সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী বিচারপতি টিএইচ খান এবং সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হকসহ ১০ বিশিষ্ট আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেন।
ব্যারিস্টার রফিক-উল হক : গতকাল ফতোয়া নিয়ে আপিলের শুনানি শুরু হলে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক সংবিধান, বিভিন্ন আইন, বিভিন্ন মামলার নজির ও বিভিন্ন দেশের রেফারেন্স তুলে ধরে আদালতে বলেন, ফতোয়া হচ্ছে সংবিধানস্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার। ফতোয়া নিষিদ্ধ করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তা আদৌ সঠিক নয়। এ ধরনের রায় দেয়ার এখতিয়ার হাইকোর্টের নেই। তিনি বলেন, ফতোয়া হচ্ছে ব্যক্তিগত অভিমত। এ অভিমতের ভিত্তিতেই আমাদের সমাজ ও পারিবারিক শৃঙ্খলা টিকে রয়েছে। অভিমত বা মতামত দেয়ার অধিকার সবার রয়েছে। এটা সাংবিধানিক অধিকারও। তবে কোনো নির্বাহী আদেশ নয়, কেউ ইচ্ছে করলে এটা গ্রহণ করতে পারে আবার নাও করতে পারে। তবে আমাদের দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ফতোয়াকে বাধ্যবাধকতা বলে মনে করে। এজন্য সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ফতোয়ার অপব্যবহার হচ্ছে। এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের দেশে প্রায় সব আইনেরই যেমন ব্যবহার রয়েছে, তেমনিভাবে এর অপব্যবহার আছে। মূল কথা হলো অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এটা করতে গিয়ে যে একেবারে আইনটিই নিষিদ্ধ করে দিতে হবে, এমনটি নয়। তিনি বলেন, কেউ যদি ফতোয়ার নামে কাউকে শাস্তি দেন, তবে সেটি অপরাধ। এ অপরাধের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারেন।
বিচারপতি টিএইচ খান : ফতোয়া নিষিদ্ধ করার অধিকার কোনো আদালতের নেই বলে উল্লেখ করে সিনিয়র আইনজীবী বিচারপতি টিএইচ খান বলেন, যারা ফতোয়া নিষিদ্ধ করে অতি-উত্সাহী রায় দিয়েছেন তারা কি একবার ভেবে দেখেছেন, ফতোয়া নিষিদ্ধ হলে এর পরিণাম কত ভয়ঙ্কর হবে? তারা হয়তো না বুঝেই এটা করেছেন। কিন্তু ফতোয়া নিষিদ্ধ করার এখতিয়ার তাদের ছিল না। তারা এখতিয়ারবহির্ভূত কাজটি করে সমাজকে একটি চরম বিশৃঙ্খল অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ীই ফতোয়া বৈধ এবং ফতোয়া দেয়া ও গ্রহণ করা সাংবিধানিক অধিকার। ফতোয়ার নামে যদি কোথাও কোনো অপরাধ হয়, সেটা প্রতিরোধ বা প্রতিকারের জন্য আমাদের দেশে প্রচলিত আইন রয়েছে। তবে এখন কেউ কেউ গ্রাম্য সালিশকেও ফতোয়া হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে লেগেছেন। এটাও ঠিক নয়। ফতোয়া নিষিদ্ধ হলে আমাদের সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। যৌতুকপ্রথা বেড়ে যাবে। সেইসঙ্গে ইভটিজিংসহ নারী নির্যাতনও বেড়ে যাবে। সামাজিক শৃঙ্খলার জন্যই ফতোয়ার বিষয়টিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ, ৪১ অনুচ্ছেদ থাকলে ধর্মীয় স্বাধীনতাও থাকবে। আর ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকলে মুসলমানদের ফতোয়া দেয়া ও নেয়ার অধিকারও থাকবে। ফতোয়ার নামে যদি কেউ এর অপব্যবহার করে, তার জন্য ইসলামের এই অবিচ্ছেদ্য বিধান অবৈধ ঘোষণা করার কোনো আইনি বা যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
বিচারপতি গোলাম রব্বানী কোনো অভিযোগ কিংবা মামলা ছাড়াই নিজ উদ্যোগে ফতোয়াকে অবৈধ ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ২০০১ সালে রায় দেন। অবসর নেয়ার পর নাস্তিক ও ভারতপন্থী হিসেবে বিচারপতি গোলাম রব্বানী তথাকথিত ঘাদানি কমিটিসহ ইসলামবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের উপদেষ্টার পদ নেন এবং তাদের অনুষ্ঠানগুলোতে যোগ দিয়ে ফতোয়াসহ ইসলামী বিধানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়া অব্যাহত রাখেন। স্বপ্রণোদিত হয়ে ফতোয়া নিষিদ্ধ করে তার দেয়া ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০১ সালেই মুফতি মো. তৈয়ব ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আপিল বিভাগে পৃথকভাবে দুটি আপিল করেন। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। বর্তমানে ওই আপিলের শুনানি চলছে। আদালত দশজন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ করে মতামত নেন। এ ছাড়াও দেশের খ্যাতিমান পাঁচ আলেমকে তাদের মতামত দেয়ার জন্য বলেছেন। গত ২০ মার্চ লিখিতভাবে তারা তাদের মতামত পেশ করেন। পাঁচ আলেমসহ অ্যামিকাস কিউরিদের প্রায় সবাই ফতোয়ার বিধান বহাল রাখা এবং হাইকোর্টের রায় বাতিলের পক্ষে মত দেন।

আল্লামা আহমদ শফিসহ ৩ হাজার আলেমের বিরুদ্ধে মামলা

স্টাফ রিপোর্টার

পেট্রোলপাম্পে আগুন, গাড়ি ভাংচুর, পুলিশের কাজে বাধা, পুলিশকে ঢিল মারা, পুলিশকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ এবং পুলিশের হাত থেকে সরকারি ওয়্যারলেস সেট ও চায়না রাইফেল ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ এনে বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা আহমদ শফির বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ৪৩৫, ৩৩২, ৪২৭, ৩৩৩, ৩৫৩, ৩০৭, ৩৭৯ এবং ৪১১ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও হাজার হাজার মাদ্রাসা শিক্ষকের ওস্তাদ আল্লামা শফির বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম বায়েজিদ বোস্তামী থানার সাব-ইন্সপেক্টর প্রিটন সরকার বাদী হয়ে এ মামলাটি করেন। মামলায় আল্লামা আহমদ শফির নাম উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে অপরাধ ঘটাতে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া বেনামি আরও ৩ হাজার ছাত্র-শিক্ষককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
আল্লামা আহমদ শফিসহ ৩ হাজার ছাত্র-শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরকারের দায়ের করা মামলাটিকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন আলেম-ওলামারা। তারা বলেন, সরকারের পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ায় এখন দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেমে দ্বীন ও হাজার হাজার শিক্ষকের শিক্ষক আল্লামা আহমদ শফির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এ মামলার কারণে সরকারের ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসবে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৪ এপ্রিল ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতালের সময় মাওলানা আহমদ শফিসহ অপরাপর উচ্ছৃঙ্খল আসামিরা পিকেটিং করে। তারা মারাত্মক ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র, লোহার রড, লাঠিসোটা নিয়ে সড়ক অবরোধ করে রাখে। তারা পেট্রোলপাম্পে আগুন দেয় এবং অসংখ্য বাস ও যানবাহন ভাংচুর করে। পুলিশ বাধা দিলে তারা পুলিশের ওপরও চড়াও হয় এবং পুলিশকে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করে। তারা পুলিশের রাইফেল ও ওয়্যারলেস সেট ছিনিয়ে নেয়। লোহার রড দিয়ে পুলিশকে পিটিয়ে মারাত্মকভাবে জখম করে।
আল্লামা আহমদ শফির বিরুদ্ধে দায়ের করা এ মামলা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে বাংলাদেশ আইম্মা পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা মুুফতি আবু ইউসুফ খান আল-মাদানী বলেন, দলমত নির্বিশেষে দেশে লাখ লাখ মানুষ আল্লামা আহমদ শফিকে শ্রদ্ধা করেন ও ভালোবাসেন। পুলিশকে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত তো দূরের কথা, জীবনে তিনি কাউকে কোনোদিন কটুকথাও বলেননি। তার মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন আলেমে দ্বীনের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হাস্যকর অভিযোগ এনে মামলা করে সরকার নিজেদেরকেই মিথ্যাবাদী হিসেবে প্রমাণ করেছে। সরকারের মিথ্যাচার ও প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির ১৩২ নেতাকর্মী রিমান্ডে

স্টাফ রিপোর্টার

গত সোমবারের হরতালের সময় রাজধানী থেকে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির গ্রেফতারকৃত ১৩২ নেতাকর্মী ও মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষককে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন থানা থেকে গতকাল তাদের ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শাহবাগ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা ১৪ জনের মধ্যে ১২ জনকে গাড়ি ভাংচুরের অভিযোগে দ্রুত বিচার আইনের মামলায় দু’দিনের রিমান্ড দেন মহানগর হাকিম ইসমাইল হোসেন। একই মামলার আরও দু’জনকে জেলগেটে সতর্কতার সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রমনা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা ৩৪ জনকে একই অভিযোগে একই আইনের মামলায় দু’দিনের রিমান্ড দেন মহানগর হাকিম এরফান উল্লাহ। মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা ১৮ জনকে দু’দিনের রিমান্ডে পাঠান মহানগর হাকিম জয়নাব বেগম। এছাড়া মোহাম্মদপুরে পুলিশের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় মো. ইসমাইল হোসেন একই আসামিদের আরও দু’দিনের রিমান্ডে পাঠান। দু’দিন রিমান্ড শেষ হলে পরের দু’দিনের রিমান্ডের কার্যকারিতা শুরু হবে।
পল্টন এলাকা থেকে পুলিশের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করা ৭৭ জনের মধ্যে তিনজনকে জামিন, ছয়জনকে সতর্কতার সঙ্গে কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদ, বাকি ৬৮ জনকে দু’দিনের রিমান্ড দেন মহানগর হাকিম শাহরিয়ার মাহমুদ আদনান। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তিনজনকে জামিন দেয়া হয়। অন্যদিকে এই ৭৭ জনের মধ্যে ৪৪ জনকে গাড়ি ভাংচুরের অভিযোগে আরেক মামলায় রিমান্ডের আবেদন করা হলে মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নূর আগামীকাল শুনানির দিন ধার্য করেন। এদের প্রত্যেককে রমনা থানার মামলায় সাত দিন এবং শাহবাগ, মোহাম্মদপুর, পল্টন থানার মামলায় পাঁচদিন করে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করে পুলিশ। আদালতে আসামিদের রিমান্ড বাতিল করে তাদের জামিনের আবেদন করে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া। তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনের মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে তারা শরিক হয়েছেন। তারা কোনো অপরাধ করেননি। সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে দায়ের করা মামলায় নির্যাতনের জন্য তাদের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করা হয়েছে। শুনানিতে তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদনীন মেজবাহ, এমএ জলিল উজ্জ্বল, বেলাল হোসেন জসিম, জাকির হোসেন, মোহাম্মদ আলীসহ অর্ধশত আইনজীবী।

যশোরে মাদ্রাসা ছাত্রদের মিছিলে গুলি : ধাওয়া করে এক হাফেজকে হত্যা












যশোর অফিস

বিতর্কিত নারীনীতির প্রতিবাদে যশোরে মাদ্রাসা ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করেছে। গুলিতে এক মাদ্রাসা ছাত্র নিহত হয়েছে। তার নাম হুসাইন আহমদ। সে কুরআনের হাফেজ। লাঠিচার্জে মাদ্রাসা ছাত্রদের মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে পুলিশ ধাওয়া করে তাকে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। এসময় লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণে আহত হয়েছে আরও ৩০ জন মাদ্রাসা ছাত্র। গুরুতর আহত একজন নিখোঁজ রয়েছে। বেলা সোয়া ১১টার দিকে মুজিব সড়কে জিলা স্কুলের সামনে বিনা উস্কানিতে পুলিশ মিছিলে হামলা চালায়। মোট ৭৭ রাউন্ড গুলিবর্ষণের কথা স্বীকার করেছে পুলিশ।
যশোরে গুলিবর্ষণ ও নিহত হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ায় দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। হত্যার প্রতিবাদ ও হরতালের সমর্থনে দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। গুলিতে মাদ্রাসা ছাত্র নিহত হওয়ার ঘটনা তদন্তে যশোরের জেলা প্রশাসক ১ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলিবর্ষণ করে মানুষ হত্যার বিচার দাবি করেছে ‘হেফাজতে ইসলাম’।
বিতর্কিত নারীনীতি বাতিলের দাবিতে দেশব্যাপী আহূত হরতালের সমর্থনে গতকাল রোববার সকালে যশোর শহরের ভৈরব চত্বরে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম। শহরের বিভিন্ন প্রবেশ পয়েন্ট দিয়ে খণ্ড খণ্ড মিছিল সকাল ১০টার পর ভৈরব চত্বরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। একটি মিছিল ভৈরব চত্বরে অবস্থান নেয়ার পর পুলিশ তাদের হটিয়ে দেয়। পরে বেলা সোয়া ১১টার দিকে আরও একটি মিছিল রেলস্টেশন এলাকা দিয়ে মুজিব সড়ক ধরে ভৈরব চত্বরের দিকে যাচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বেলা সোয়া ১১টার দিকে মিছিলটি জিলা স্কুলের কাছাকাছি পৌঁছলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় হেফাজতে ইসলাম নেতাদের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ মিছিলকারীদের ওপর আক্রমণ করে। মিছিলকারীরাও পাল্টা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। কিছু সময় পর আকস্মিক গুলিবর্ষণ শুরু করে পুলিশ। এতে মিছিলকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় পুলিশ ধাওয়া করে রেলস্টেশনের কাছে একটি নর্দমার মধ্যে হুসাইন আহমেদ নামে এক মিছিলকারীকে ধরে ফেলে। পুলিশ হুসাইন আহমেদকে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে গুরুতর জখম করে। যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার পর হুসাইন আহমদ মারা যায়। নিহত হুসাইন আহমদ মনিরামপুরের মাদানিনগর কওমী মাদ্রাসা থেকে কুরআনে হাফেজ হওয়ার পর ওই মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণীতে লেখাপড়া করতো। নিহত হুসাইন মাদানিনগর মাদ্রাসার মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবেও কর্মরত ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, হুসাইন আহমদ পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর তার জীবন রক্ষার্থে অনেক কাকুতি-মিনতি করে। আশপাশের বাড়ির মহিলারাও হুসাইনকে গুলি না করার জন্য পুলিশের হাতে-পায়ে ধরে অনুরোধ জানায়। সবার অনুরোধ উপেক্ষা করে পুলিশের এক সদস্য পেটে শটগান ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করে হুসাইনকে।
এদিকে সংঘর্ষ চলাকালে লাঠি, ইট প্রভৃতির আঘাতে চার পুলিশ, এক সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়। আহত তিন পুলিশ সদস্যকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এরা হলো—কনস্টেবল কামরুল ইসলাম, শামসুজ্জোহা ও হেলালউদ্দিন। এসআই মিজান প্রাথমিক চিকিত্সা নিয়েছেন। কর্তব্য পালনকালে ইটের আঘাতে আহত হয়েছেন স্থানীয় দৈনিক লোকসমাজের চিফ ফটোসাংবাদিক হানিফ ডাকুয়া।
ঘটনার পর বিকেলে স্থানীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটির নেতারা দাবি করেন, তারা ভৈরব চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশের জন্য আগেই প্রশাসনের অনুমতি নিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও পুলিশ বিনা উস্কানিতে তাদের মিছিলে হামলা চালিয়েছে। পুলিশের গুলিতে একজন নিহত হওয়া ছাড়াও আশিকুর রহমান নামে একজন নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ আশিক মাদানিনগর মাদ্রাসার ছাত্র। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের হামলায় আহতদের একাংশের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরা হলেন— মাদানিনগর মাদ্রাসার ছাত্র মো. মাশুকুর রহমান, মো. আবদুল আলিম, মো. আবু বকর, মো. হায়দার আলী, মো. মাহমুদুল হাসান, মো. মুস্তাইন বিল্লাহ, আব্দুর রহমান, মো. বেলাল হোসেন, মো. রাশেদুল ইসলাম, আল আমিন, মো. রাশিদুল ইসলাম, যশোর রেলস্টেশন মাদ্রাসার ছাত্র মো. কামরুল ইসলাম, ইসমাইল হোসেন এবং একই মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আবুল খায়ের, মাওলানা আনোয়ারুল করিম ও মাওলানা আব্দুল হক।
সংবাদ সম্মেলন থেকে বিনা উস্কানিতে মিছিলে গুলিবর্ষণ করে মানুষ হত্যার তীব্র নিন্দা করা হয়। সংগঠনটির নেতারা এ ঘটনার জন্য দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিচারের দাবি জানান। এক প্রশ্নের জবাবে হেফাজতে ইসলামের নেতারা জানান, আজ আহূত হরতালে তারা মাঠে থাকবেন।
সংবাদ সম্মেলনে হেফাজতে ইসলাম নেতা মুফতি আরিফ বিল্লাহ, মীর মোহর আলী, রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, আবদুল হালিম, মাওলানা আবুল খায়ের, মাওলানা আল আমিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
গুলিতে মাদ্রাসা ছাত্র নিহত হওয়া প্রসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসেন ও কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইমদাদুল হক শেখ বলেন, শুধু ১২ রাউন্ড রাবার বুলেট ছুড়েছে পুলিশ। মিছিলকারীদের কাছে রক্ষিত আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে হুসাইন আহমদ মারা গেছে বলে পুলিশ দাবি করেন। পুলিশ সুপার কামরুল আহসানও এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান। পরে অবশ্য কোতোয়ালি থানার সেকেন্ড অফিসার মুস্তাফিজুর রহমান শটগানের ৭৭ রাউন্ড গুলি ছোড়ার কথা স্বীকার করেন। বিকেলে এ রিপোর্ট লেখার সময় ঘটনার ব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করার প্রস্তুতি চলছিল।
অন্যদিকে মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনা শোনার পর পরই যশোর সদর আসনের সংসদ সদস্য খালেদুর রহমান টিটো ও জেলা প্রশাসক মো. নূরুল আমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে হাফেজ হুসাইন আহমদ হত্যার বর্ণনা শোনেন। পরে জেলা প্রশাসক মো. নূরুল আমিন ঘটনা তদন্তে এক সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির একমাত্র সদস্য হলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মীর জহুরুল ইসলাম।
ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির জেলা সভাপতি আনোয়ারুল করিম যশোরী আমার দেশকে বলেন, হরতালের সমর্থনে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ হামলা চালায়। মিছিলকারীদের হাতে কোনো অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। প্রত্যেকের হাতে ছিল পবিত্র কোরআন শরিফ। তিনি আজকের হরতাল স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালনের মাধ্যমে জালিমদের অত্যাচারের জবাব দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
পুলিশের গুলিতে নিহত হুসাইন আহমদের লাশের ময়নাতদন্ত যশোর জেনারেল হাসপাতাল মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। বাদ আছর কেন্দ্রীয় ঈদগাহে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও পুলিশ লাশ হস্তান্তরে বিলম্ব করায় জানাজা বিলম্বে অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে নিহতের জানাজা শেষে পুলিশ লাশ কর্ডন করে তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করে। এসময় নিহতের গ্রামের বাড়িতে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
শেরপুরে জামায়াত নেতাসহ ৬ জন গ্রেফতার : শেরপুর প্রতিনিধি জানান, ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি আহূত হরতালকে সামনে রেখে ভোরে শেরপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর জেলা মজলিশে শূরার সদস্য ও সাবেক জেলা আমির ডা. আব্দুল জলিলসহ ৬ জনকে শেরপুর সদর থানা পুলিশ গ্রেফতার করে। অন্য গ্রেফতারকৃতরা হলেন শেরপুর তেরাবাজার জামিয়া সিদ্দিকিয়া মাদ্রাসার সুপার মাওলানা নুরুল ইসলাম, সহকারী সুপার মাওলানা সিদ্দিক আহমেদ, পূর্বশেরী মহিলা মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আজিজুল হক, তেরাবাজার মাদ্রাসার কর্মচারী খলিলুর রহমান ও সৈয়দ আহমদ। এছাড়া পুলিশ ৩২০টি পোস্টার ও প্রচারপত্র আটক করে। পরে রোববার বিকেলে শেরপুর সদর থানা পুলিশ তাদেরকে শেরপুরের মুখ্য বিচারিক হাকিম মিয়া মোহাম্মদ আলী আকবার আজিজীর আদালতে সোপর্দ করে। আদালত জামিনের আবেদন মঞ্জুর করে তাদেরকে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দেন।
সিরাজগঞ্জে মিছিলে পুলিশের বাধা : সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ বাতিল এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ও ফতোয়াবিরোধী হাইকোর্টের রায় বাতিলের দাবিতে সিরাজগঞ্জে ওলামা-মাশায়েখদের সভায় বাধা দিয়েছে পুলিশ। তানযীমুল মাদারিস দ্বীনিয়া সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার উদ্যোগে গতকাল সকাল ১০টায় স্বাধীনতা স্কয়ারে ডাকা সভা করতে না পারায় আলেমদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিলেও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পরে রেলওয়ে কলোনি কওমী মসজিদে মাওলানা মাহমুদুল আলমের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য রাখেন মাওলানা আব্দুল হক হক্কানী, মাওলানা নজরুল ইসলাম, মাওলানা আব্দুস সালাম, মাওলানা আম্বর আলী, মাওলানা আহম্মদ আলীসহ প্রমুখ